ভারতের শাসক রাজনীতির মুখোশ খুলে দিতে মাঝে মাঝে একটি ঘটনাই যথেষ্ট। হায়দ্রাবাদে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নামে রাস্তার নামকরণ তেমনই একটি ঘটনা। মার্কিন কনস্যুলেটের সামনে রাস্তার নাম রাখা হয়েছে “ডোনাল্ড ট্রাম্প অ্যাভিনিউ”। আর এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে তেলেঙ্গানার কংগ্রেস সরকার। যুক্তি— এতে নাকি আন্তর্জাতিক মহলে হায়দ্রাবাদের পরিচিতি বাড়বে, ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক আরও মজবুত হবে। এই যুক্তি শুনলে হাসি পায়, আবার লজ্জাও হয়। কারণ এর মধ্যে শুধু রাজনৈতিক হীনমন্যতাই নেই, আছে এক ধরনের প্রকাশ্য দাসসুলভ মানসিকতা— যেন ভারতের শহরকে চিনতে, ভারতের কূটনীতিকে গুরুত্ব দিতে, ভারতের শাসকদের পাশে দাঁড়াতে একজন মার্কিন প্রেসিডেন্টের নাম ধার করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।
প্রশ্নটা একটি রাস্তার নামের নয়। প্রশ্নটা শাসকশ্রেণির চরিত্রের। প্রশ্নটা এই যে, দিল্লিতে বিজেপি আর হায়দ্রাবাদে কংগ্রেস— মুখে যতই একে অন্যের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করুক, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সামনে এসে কি দু’পক্ষই একইভাবে নতজানু নয়? আজকের এই নামকরণ সেই প্রশ্নকেই নগ্নভাবে সামনে এনে দিয়েছে।
বিজেপি দীর্ঘদিন ধরেই “শক্তিশালী ভারত”, “বিশ্বগুরু ভারত”, “আত্মনির্ভর ভারত”-এর স্লোগান তুলে জনতার আবেগে আগুন জ্বালাতে চেয়েছে। কিন্তু বাস্তব কী? বাস্তব হল, মার্কিন চাপের সামনে মোদী সরকার বারবার নতি স্বীকার করেছে। কোভিডের সময় ট্রাম্পের প্রকাশ্য চাপের মুখে হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন পাঠানো হোক, রাশিয়া থেকে তেল কেনা নিয়ে মার্কিন রক্তচক্ষুর সামনে কৌশলী নমনীয়তা হোক, কিংবা আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে আমেরিকার ইশারার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার প্রবণতা— সব ক্ষেত্রেই বিজেপির “জাতীয়তাবাদ” আসলে কতটা ফাঁপা, তা স্পষ্ট হয়েছে। মুখে দেশপ্রেম, কাজে মার্কিন তোষণ— এই দ্বিচারিতাই আজকের শাসক রাজনীতির মূল চরিত্র।
কিন্তু কংগ্রেস কি আলাদা? তেলেঙ্গানার ঘটনা বলছে— একেবারেই নয়। বিরোধী আসনে বসে রাহুল গান্ধী কেন্দ্রের মার্কিনঘেঁষা নীতির সমালোচনা করতে পারেন, বিজেপির বিদেশনীতি নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারেন, কিন্তু ক্ষমতায় বসেই যদি তাঁর দল ট্রাম্পের নামে রাস্তা বানায়, তাহলে সেই সমালোচনার বিশ্বাসযোগ্যতা কোথায় থাকে? দিল্লিতে এক কথা, ক্ষমতায় আরেক কথা— এই দ্বিচারিতা নতুন নয়, কিন্তু এবার তা নগ্ন। কংগ্রেস আসলে বিজেপিরই আরেক সংস্করণ— ভাষা আলাদা, ভঙ্গি আলাদা, কিন্তু সাম্রাজ্যবাদী শক্তির প্রতি আনুগত্যের জায়গায় মৌলিক কোনো ফারাক নেই।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ হল বিজেপির নীরবতা। যে বিজেপি “বিদেশি” নাম নিয়ে হঠাৎ দেশপ্রেমের ঝান্ডা তোলে, কার্ল মার্ক্স, লেনিন, হো চি মিন বা অন্য আন্তর্জাতিক বিপ্লবী ব্যক্তিত্বদের নামে রাস্তা থাকলে আপত্তি জানায়, সেই বিজেপি ট্রাম্পের নামে রাস্তা হলে চুপ কেন? পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভায় প্রশ্ন তোলা হয়— “লেনিন কোনোদিন ভারতে এসেছেন? ভারতের ইতিহাসে যাদের কোনো মূল্য নেই, তাদের নামে রাস্তা থাকবে কেন?” খুব ভালো কথা। তাহলে ডোনাল্ড ট্রাম্প কোন ভারতের ইতিহাসে অবদান রেখেছেন? তিনি কি স্বাধীনতা সংগ্রামী? তিনি কি ভারতীয় সমাজসংস্কারক? তিনি কি ভারতের কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, যুব বা গণতান্ত্রিক অধিকারের লড়াইয়ে কোনো ভূমিকা রেখেছেন? না, কিছুই নয়। তবু তাঁর নামে রাস্তা হলে বিজেপির গলায় আওয়াজ নেই। কারণ আপত্তি “বিদেশি” নাম নিয়ে নয়; আপত্তি বামপন্থী, প্রগতিশীল, সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ঐতিহ্যের বিরুদ্ধে। ট্রাম্পের নাম তাদের সমস্যার নয়, কারণ ট্রাম্প সেই বিশ্বরাজনীতির প্রতিনিধি, যার সঙ্গে ভারতীয় শাসকশ্রেণির বড় অংশের স্বার্থের সখ্য আছে।
তেলেঙ্গানার কংগ্রেস সরকারের যুক্তি— এতে হায়দ্রাবাদের জনপ্রিয়তা বাড়বে— আসলে আত্মসম্মানবোধহীনতার সরকারি ভাষ্য। হায়দ্রাবাদ কি এমনই অনাথ শহর, যার পরিচিতির জন্য ট্রাম্পের নাম ধার করতে হবে? চারমিনার, গোলকোন্ডা, তথ্যপ্রযুক্তি শিল্প, শিক্ষাকেন্দ্র, চিকিৎসা পরিষেবা, ঐতিহাসিক ও বহুসাংস্কৃতিক চরিত্র— এসব কিছুই কি যথেষ্ট নয়? একটি শহরের মর্যাদা তার নিজস্ব ইতিহাসে, মানুষের পরিশ্রমে, সামাজিক-অর্থনৈতিক শক্তিতে তৈরি হয়; কোনো বিদেশি রাষ্ট্রনেতার নামের লেবেল সেঁটে নয়। ট্রাম্পের নাম জুড়ে দিয়ে হায়দ্রাবাদকে “বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরা”র গল্প আসলে নিজের শহরের মর্যাদাকেই ছোট করা।
আর ডোনাল্ড ট্রাম্প কে? তিনি কোনো সর্বজনস্বীকৃত মানবতাবাদী নেতা নন। তিনি মার্কিন আগ্রাসী জাতীয়তাবাদ, বাণিজ্যিক চাপ, বর্ণবাদী মেরুকরণ, যুদ্ধোন্মাদ কূটনীতি এবং বিশ্বরাজনীতিতে দাদাগিরির প্রতীক। তাঁর নামে ভারতের একটি শহরের রাস্তার নামকরণ নিছক কূটনৈতিক সৌজন্য নয়; এটি রাজনৈতিক বার্তা। এই বার্তা স্পষ্ট— ভারতের শাসকশ্রেণির বড় অংশ এখনও মনে করে, ওয়াশিংটনের দিকে তাকিয়ে থাকাই আন্তর্জাতিক মর্যাদার চাবিকাঠি।
এখানেই বিজেপি ও কংগ্রেসের মুখোশ একসঙ্গে খুলে যায়। একদল মুখে জাতীয়তাবাদ বিক্রি করে, অন্যদল মুখে উদার গণতন্ত্রের বুলি আওড়ায়; কিন্তু মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের প্রশ্নে দু’পক্ষের হাঁটু একই জায়গায় নুয়ে পড়ে। কেউ তা করে প্রকাশ্যে, কেউ তা করে পরিশীলিত ভাষায়; কিন্তু কাজের বেলায় দু’পক্ষের তফাৎ দ্রুত মিলিয়ে যায়। “ডোনাল্ড ট্রাম্প অ্যাভিনিউ” তাই শুধু একটি সাইনবোর্ড নয়; এটি ভারতীয় মূলধারার রাজনীতির আত্মসমর্পণের ফলক।
আজ দরকার স্পষ্ট করে বলার— ভারতের শহর, ভারতের ইতিহাস, ভারতের জনতার আত্মমর্যাদা কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের নামের মুখাপেক্ষী নয়। যে রাজনীতি নিজের দেশকে বড় করে দেখতে শেখায় না, বরং সাম্রাজ্যবাদী শক্তির প্রশংসাপত্রকে সম্মান বলে চালাতে চায়, সেই রাজনীতি দেশপ্রেমের কথা বলার নৈতিক অধিকার হারায়। হায়দ্রাবাদের এই রাস্তার নাম তাই শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি বিজেপি ও কংগ্রেস— উভয়ের সাম্রাজ্যবাদপুষ্ট মানসিকতার প্রকাশ্য দলিল।
দেশবাসীর সামনে তাই প্রশ্ন এখন একটাই— যারা মুখে দেশপ্রেম, আত্মনির্ভরতা, জাতীয় মর্যাদার বুলি আওড়ায়, তারাই যদি মার্কিন প্রেসিডেন্টের নামে রাস্তা বানিয়ে গর্ববোধ করে, তাহলে তাদের দেশপ্রেমের দাবিকে আর কতদিন গুরুত্ব দেওয়া যায়? হায়দ্রাবাদের এই ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিল— শাসকদল বদলায়, পতাকা বদলায়, ভাষণ বদলায়; কিন্তু সাম্রাজ্যবাদের দরবারে মাথা নোয়ানোর রাজনীতি একই থেকে যায়।
